গ্রাহকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে অংশীদারভিত্তিক

01 Oct

গ্রাহকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে অংশীদারভিত্তিক

সম্প্রতি বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে যোগ দিয়েছেন মো. কায়সার হামিদ। এর আগে তিনি আইপিডিসি ফাইন্যান্সের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল বিজনেস বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশনস সিস্টেমসের স্নাতক কায়সার হামিদ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবচেয়ে তরুণ প্রধান নির্বাহী। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক অবস্থা ও বিডি ফাইন্যান্সের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন— মেহেদী হাসান রাহাত

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই।

বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেনের জন্য ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্ট থাকে, সেটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো করতে পারে না বলেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের মতো গ্রাহকের সঙ্গে ফার্স্ট রিলেশনশিপ করতে পারে না। তাকে সেকেন্ড রিলেশনশিপ করতে হয়। অর্থাৎ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থাকবে ব্যাংকের কাছে; আর তার যেসব আর্থিক চাহিদা বা সেবা সেগুলো সরবরাহ করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গ্রাহক আকর্ষণ করতে হলে ব্যাংকের চেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা থাকা আবশ্যক। এ জায়গায় আমরা একটি ভিন্ন ব্যবসায়িক মডেল বা স্বাতন্ত্র্য তৈরি করতে পারিনি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট। এ দুটো আবার একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো, মর্টগেজভিত্তিক আর্থিক পণ্যসহ বিশেষায়িত ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করতে হলে তহবিলের জোগানটাও হতে হয় দীর্ঘমেয়াদের। যেমন বিভিন্ন ধরনের ডেরিভেটিভস, সাবঅর্ডিনেট ও জিরো কুপনসহ পারপেচুয়াল বন্ড, যেগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনযোগ্য হবে, এমন ধরনের বন্ডের মাধ্যমে আমরা সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদে তহবিল সংগ্রহ করতে পারতাম। এতে আমরা যে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিচ্ছি, সেটার সঙ্গেও পুরোপুরি মানানসই হতো। কিন্তু দেশে বন্ড মার্কেট সেভাবে এখনো গড়ে না ওঠায় আমাদের কিন্তু ব্যাংকের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্লেসমেন্ট ফান্ড ও ডিপোজিট নিয়ে তহবিলের চাহিদা মেটাতে হয়েছে। ফলে ব্যাংকের কাছ থেকে তহবিল নিয়ে তুলনামূলক বেশি সুদে সেটি আবার আমরা গ্রাহককে দিয়েছি। বেশি সুদ দিয়ে গ্রাহক টানতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে ভালো গ্রাহকদের পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। আরেকটি দিক হচ্ছে, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে যে ধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল, সেটি সম্ভব হয়নি। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে তাদের পরিচিত কিংবা ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠীকে ঋণ দিয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের মধ্যে, বিশেষ করে এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, এমনটিও হয়েছে। আর স্বাভাবিকভাবেই কিন্তু এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে তিন-চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশ সমস্যার মধ্যে রয়েছে। সার্বিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে বাদ দিলে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে চলে আসবে। এবার আসি তারল্য সংকটের বিষয়ে। শুরু থেকেই আমরা দীর্ঘমেয়াদে তহবিল সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎস তৈরি করতে পারিনি। আবার গ্রাহকদের কাছ থেকেও ব্যাপক হারে আমানত সংগ্রহ করতে পারিনি। গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে যে আস্থা অর্জন করা প্রয়োজন ছিল, যে ধরনের ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন ছিল, ব্রাঞ্চভিত্তিক রিলেশনশিপ তৈরির প্রয়োজন ছিল, বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানই সে পথে হাঁটেনি। এর ফলে তহবিলের জন্য আমাদের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকিও বেড়েছে। এ সংকট আগেও ছিল। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে এটি আরো প্রকট হয়েছে। ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণের সীমা কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি আমানত উঠিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে করোনার কারণে অনেক গ্রাহক সক্ষমতার অভাবেই হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক, ঋণের কিস্তি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্যের দিক দিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গিয়েছে। আমি মনে করি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার স্বার্থে বিদ্যমান ব্যবসায়িক মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি টেকসই ও সুদৃঢ় ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলতে না পারলে করোনার চ্যালেঞ্জ না থাকলেও এমনিতেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারবে না। সবার আগে আমাদের গ্রাহকের আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য গ্রাহকদের দোরগোড়ায় গিয়ে তাদের কাছে নিজেদের আর্থিক সক্ষমতাগুলো তুলে ধরতে হবে। তবে তা ঢাকায় বসে সম্ভব নয়। ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের কাছে আরো বেশি পৌঁছাতে হবে। যদিও ঢাকার জনসংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের মধ্যে ঢাকায় ব্যাংকিং ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।

প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলের বাইরে কৃষি বা অন্যান্য খাতভিত্তিক মডেলে কাজ করার সুযোগ থাকলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাতে অংশগ্রহণ করছে না কেন?

আপনি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। ভারতে কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই ব্যবসা করছে। সেখানে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান শুধু হোম লোন নিয়ে কাজ করছে, আবার আরেকটি প্রতিষ্ঠান কৃষিভিত্তিক সুনির্দিষ্ট সরঞ্জাম, যেমন ট্রাক্টর নিয়ে কাজ করছে। সেখানে স্বর্ণ কেনার জন্য অর্থায়ন করছে, এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কেউ কেউ বাইক, গাড়ি বা শুধু ভোক্তাঋণ নিয়েও কাজ করছে। আমাদের এখানে এ ধরনের মডেল চালু করতে দুটি জিনিস লাগবে। এর একটি হচ্ছে প্রযুক্তি। আপনি যদি ব্যক্তিনির্ভর মডেলে এগোতে চান, তাহলে এজন্য যে পরিমাণ কর্মী ও ব্রাঞ্চের প্রয়োজন হবে, সেটি পরিচালন ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেবে ও ব্যবসায়িকভাবে টেকসই হবে না। ফলে এখানে প্রযুক্তি লাগবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করতে হলে আপনার ফোকাস ও দক্ষতারও প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তি, ফোকাস ও দক্ষতার মাধ্যমে আপনি এ মডেলে ব্যবসা করে সফল হতে পারবেন। আমি মনে করি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ মডেল অনুসরণ করতে পারে।

বিডি ফাইন্যান্স কি এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলে আগ্রহী?

আমরা শুরু থেকেই করপোরেট খাতে অর্থায়নের দিকেই মনোযোগী ছিলাম। কিন্তু গত কয়েক বছরে আমরা করপোরেট খাতে অগ্রাধিকার কমিয়ে দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) এবং রিটেইল গ্রাহকদের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছি। এরই মধ্যে আমরা নতুন একটি বিশেষ পণ্য চালু করেছি, যেটির নাম হচ্ছে ফ্যামিলি এমপাওয়ারমেন্ট ক্রেডিট প্ল্যান বা এফইসিপি। এর আওতায় আমরা গ্রাহকদের ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছি। যেসব ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পান না, আবার এনজিওগুলোও তাদের অর্থায়ন করে না, এমন গ্রাহকদের ব্যবসায় সহায়তা করতে আমরা এগিয়ে এসেছি। এক্ষেত্রে আমরা পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছি। যেমন আপনি হয়তো বাড়ি করার জন্য আমাদের ঋণ নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে আমরা আপনার বাড়িটিকে পরিবেশবান্ধব করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেব। আবার আমরা পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ক্ষেত্রেও অর্থায়ন করছি। যেসব যানবাহন জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব, সেগুলোয় আমরা অর্থায়ন করছি। এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য আমাদের তহবিলের জোগানও গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য আমরা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট বা সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবা নিয়ে এসেছি। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় এ ধরনের সেবা দেয়া হয়। এর আওতায় আমরা একজন গ্রাহকের সারা জীবনের আর্থিক সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করব। ধরুন একজন চাকরিজীবী তার প্রতি মাসের আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করছে এবং এ অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতে তার বিভিন্ন প্রয়োজন যেমন ফ্ল্যাট কেনা, সন্তান ও পিতামাতার ভবিষ্যৎ
আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার মতো প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা সে গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, বীমা ও ব্যাংক আমানতের সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ প্যাকেজ তৈরি করেছি। এজন্য আমরা একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করতে যাচ্ছি, যেটার সঙ্গে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ই-ওয়ালেট ও ব্যাংক হিসাব সংযুক্ত থাকবে। ফলে একজন গ্রাহক সহজেই ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে তার পছন্দমতো স্কিম বেছে নিতে পারবেন। আবার আমরা এর মাধ্যমে গ্রাহকের ই-কেওয়াইসিটাও করতে পারব। আমরা গ্রাহকের প্রয়োজন ও পরিকল্পনা অনুসারে তার কী পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করতে হবে বা কোন স্কিম বেছে নিতে হবে, সেটা ডিজাইন করে দেব। তরুণ বয়স থেকে আমরা একজন গ্রাহকের সহযাত্রী হতে চাই। শিক্ষাকালে একটি বাইক ঋণের মাধ্যমে হয়তো আমরা গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করলাম। পরবর্তী সময়ে যখন সে গ্রাহক পেশাগত জীবনে প্রবেশ করবেন তখন তার সে সময়কার আর্থিক প্রয়োজন মেটানো থেকে শুরু করে গাড়ি বা বাড়ির জন্য ঋণ, সন্তানদের শিক্ষাঋণ বা বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তা,
সবকিছুর সঙ্গেই আমরা থাকতে চাই। গ্রাহকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা হবে অংশীদারভিত্তিক।

আমরা মানবিক ব্যাংকিং থেকে অনেক দূরে রয়েছি। আমরা গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের ভাষায় কথা বলি, যেটি তাদের জন্য অনেক সময় দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। এখানে আমরা একটি পরিবর্তন আনতে চাইছি। গ্রাহক যেভাবে বুঝতে সমর্থ হবেন, সেভাবেই আমরা তাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে চাই। ভারতে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান রয়েছে, যার মাধ্যমে পুঁজিবাজারের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগ করা হয়। একইভাবে আমরাও গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থের একটি অংশ পুঁজিবাজারের বাছাইকৃত ব্লুচিপ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে চাই, যেখান থেকে তিন বা পাঁচ বছর পরে একটি হ্যান্ডসাম রিটার্ন আসবে। পাশাপাশি আমরা বন্ড নিয়ে আগ্রহী। আমরা যে ধরনের সেবা দিতে চাইছি, সেজন্য বন্ডের মতো দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পারপেচুয়াল বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে, যেগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনযোগ্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ ধরনের সুযোগ রয়েছে কি?

আমি মনে করি ব্যাংকের তুলনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের বন্ডের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। বিএসইসির পক্ষ থেকেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড ইস্যুর জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইক্যুইটির মতো দীর্ঘমেয়াদি তহবিল হিসেবে আমরা বন্ডের বিষয়ে বেশ আগ্রহী।

বিডি ফাইন্যান্সকে ভবিষ্যতে কোন অবস্থানে দেখতে চান?

আমাদের মূল ফোকাস হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করা। তাদের আস্থা অর্জন করতে পারলে আমাদের ভবিষ্যতের পথচলা অনেকটাই মসৃণ হবে। দুই-তিন বছরের মধ্যে বিডি ফাইন্যান্সকে প্রথম সারির কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাতারে নিয়ে আসতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের দুটি সহায়ক শক্তি রয়েছে। এর একটি হচ্ছে আমাদের পর্ষদ। আপনারা সবাই জানেন, বিডি ফাইন্যান্সের পর্ষদে উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে রয়েছে আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, যাদের ২০০ বছরের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের পর্ষদে দক্ষ ও প্রথিতযশা ব্যাংকার ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট রয়েছেন। যাদের এ প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ নেয়ার কোনো রেকর্ড নেই। আরেকটি দিক হচ্ছে আমাদের কর্মীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। আমরা যে ধরনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছি, সেজন্য আমাদের কর্মোদ্যমী জনবল প্রয়োজন। গ্রাহকদের সব ধরনের আর্থিক সেবা পূরণে আমরা কাজ করছি। গ্রাহক যদি সব ধরনের আর্থিক সেবা একটি প্লাটফর্ম থেকে পায় তাহলে তারা সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকবে।

অতীতে আমরা দেখেছি কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট গ্রাহকদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়?

এটা ঠিক কিছু প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারেনি। এটা শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে পথ বন্ধ করে দিতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কেন বেড়েছে এবং এ ধরনের ঋণগুলো কী প্রক্রিয়ায় দেয়া হয়েছে, সেগুলো খুঁজে বের করে যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যায়, তাহলেই কিন্তু এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। আমাদের দেশে কিন্তু এমন কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর অবস্থা অনেক ব্যাংকের চেয়েও ভালো।

আপনারা গ্রাহকের গচ্ছিত আমানতের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের কথা বলছেন। আমরা সবাই জানি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে রিটার্ন যেমন বেশি, তেমনি ঝুঁকিও কিন্তু বেশি।

অবশ্যই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি কতটুকু ঝুঁঁকি নিতে চান, তার ওপর নির্ভর করছে আপনার আমানতের কত শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। তবে আমরা মনে করি এটি ইক্যুইটির ১০-২৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। তাছাড়া আপনি যদি ট্রেডিং করেন অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদের জন্য বিনিয়োগ করেন, তাহলে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এক্ষেত্রে কখনো আপনি মুনাফা করবেন আবার কখনো আপনাকে পুঁজি হারাতে হবে। অন্যদিকে আপনি যদি বিনিয়োগ করেন মানে দীর্ঘ সময়ের জন্য মৌলভিত্তির ভালো কোম্পানি, যার আর্থিক সক্ষমতা ভালো, ব্যবসা প্রবৃদ্ধি রয়েছে, ধারাবাহিকভাবে ভালো পরিমাণে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে,
 এমন কোম্পানিতে আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করেন তাহলে সেটি কিন্তু আপনাকে উল্লেখযোগ্য হারে রিটার্ন দেবে। আমরা চাইছি মানুষের মধ্যে ট্রেডিংয়ের যে প্রবণতা রয়েছে, সেটিকে পরিবর্তন করে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে।

গ্রাহকের আমানতের বাইরে নিজস্ব পোর্টফোলিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

আমরা পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করেছি। পুঁজিবাজারের কোন কোম্পানি বা কোন খাতে বিনিয়োগ করা হবে, কতটুকু পর্যন্ত লোকসান কিংবা লাভ হলে শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যেতে হবে, সেগুলো আমরা নির্ধারণ করেছি। আমাদের পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা পুঁজিবাজারভিত্তিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। তবে মূল প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাকে আমরা এসএমই, রিটেইল ও কিছু নির্বাচিত করপোরেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।

কভিড-১৯-এর এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

এখন পর্যন্ত এ বছরের অর্ধবার্ষিক পর্যন্ত আর্থিক ফলাফল আমরা প্রকাশ করেছি। তাতে আমাদের পারফরম্যান্স বেশ ভালো। সামনের প্রান্তিকে আরো বেশি ভালো করতে পারব বলে আশা করছি। তাছাড়া বছর শেষেও আমাদের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা থাকবে। ২০১৯ সালে আর্থিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আমরা বিনিয়োগকারীদের ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিলাম। এ বছরও আশা করছি সমপরিমাণ বা এর চেয়ে ভালো লভ্যাংশ দিতে পারব। তাছাড়া আমরা যেসব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিতে পারব। তাছাড়া বিনিয়োগকারীদের ইক্যুইটি নিয়ে আমরা ব্যবসা করছি, এজন্য তাদের প্রতি আমরা দায়বদ্ধ। পুঁজিবাজারে গত কয়েক মাসে আমাদের বাজার মূলধন দ্বিগুণ হয়েছে, যা আমাদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আমরা তাদের এ আস্থা ধরে রেখে এর উপযুক্ত প্রতিদান দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

To read the original content on Bonikbarta, click here.